• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন

দৈনন্দিন জীবনে বরকত লাভের উপায়

ধর্ম ডেক্স
Update : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বহুল ব্যবহৃত এবং অত্যন্ত পরিচিত একটি শব্দ বরকত। সাধারণ অর্থে বরকত বলতে আমরা কেবল অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বা বৈষয়িক উন্নতিকে বুঝে থাকি। তবে ইসলামের মূল ভাবনায় বরকতের পরিধি শুধু বস্তুগত লাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরকত মূলত একটি ঐশ্বরিক নিয়ামত, যা মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শান্তি, সন্তুষ্টি এবং পূর্ণতা নিয়ে আসে।

প্রাত্যহিক জীবনে বরকতের গুরুত্ব এবং এর প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরা হলো :

বরকত কী?

মুসলিম হিসেবে প্রতিদিনের কথাবার্তা, দোয়া এবং বিশেষ করে পারস্পরিক অভিবাদনে আমরা বরকত শব্দটি ব্যবহার করি। যেমন কাউকে সালাম দেওয়ার সময় আমরা বলি, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। ঈদের দিনে বলি ঈদ মোবারক। এমনকি নতুন বিবাহিত দম্পতির জন্যও সুন্নত হিসেবে বরকতের দোয়া করি।

আরবি ব্যাকরণ ও ভাষা তত্ত্ব অনুযায়ী বরকত শব্দের কয়েকটি চমৎকার অর্থ রয়েছে। শাব্দিক অর্থে এটি স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তার প্রতীক। এর আরেকটি অর্থ হলো প্রবৃদ্ধি বা পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়া। সহজ কথায়, কোনো কাজে বা বিষয়ে যখন বরকত থাকে, তখন খুব সামান্য প্রচেষ্টা বা উপাদান থেকেও বহুগুণ বেশি ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়।

এছাড়া বরকতের অন্যতম অর্থ হলো নিরবচ্ছিন্নতা বা কোনো ভালো কাজের ধারা অবিরত বজায় থাকা। সামগ্রিকভাবে বরকত হলো এমন এক আত্মিক ধারণা বা ঐশ্বরিক উপহার, যা মানুষের জীবনে কল্যাণ ও প্রাচুর্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করে এবং সেই কল্যাণকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেয়।

বরকতের গুরুত্ব এত বেশি কেন?
পবিত্র কোরআনের ২৪টি সূরায় বিভিন্ন রূপে অন্তত ৩২ বার বরকত শব্দটি উল্লেখ রয়েছে। স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারিমকে মোবারক বা বরকতময় গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সূরা আল-আনআমের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আর এটি এমন একটি কিতাব যা আমি নাজিল করেছি, যা অত্যন্ত বরকতময়।

হাদিসে বরকতের এই রূপটি আরও স্পষ্ট হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি সহীহ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকির সওয়াব ১০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আলিফ-লাম-মীম মিলে একটি অক্ষর নয়; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম আরেকটি পৃথক অক্ষর।

এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত এলে মানুষের সামান্য শ্রমের বিপরীতে প্রাপ্তি কতটা বিশাল হতে পারে। বরকত থাকলে সীমিত সম্পদ বা অল্প সময় নিয়েও জীবনে চমৎকার সব সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়।

দৈনন্দিন জীবনে বরকত ফিরিয়ে আনার উপায়

অনেক সময় কোনো জিনিসের অভাব দেখা দিলে আমরা তার গুরুত্ব টের পাই। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের প্রচুর অর্থ-সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মনের ভেতর এক ধরণের শূন্যতা কাজ করে। আবার অনেকের সীমিত আয় থাকা সত্ত্বেও তারা অত্যন্ত সুখী ও তৃপ্ত জীবনযাপন করেন। এই তৃপ্তির মূল কারণ হলো বরকত।

জীবনে বরকত পাওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সূরা ইব্রাহীমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেবো।

পেশাদার ও ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনে বরকত ফিরিয়ে আনতে পারি।

১. দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা

আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে অন্তত কিছুটা সময় আন্তরিকভাবে দোয়ার জন্য রাখা উচিত। বিশেষ করে জীবনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র—সময়, সম্পদ এবং স্বাস্থ্যের বরকতের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা প্রয়োজন।

সময়ের বরকত আমাদের কর্মদক্ষতা বাড়ায়, সম্পদের বরকত অভাব দূর করে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয় এবং স্বাস্থ্যের বরকত আমাদের অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

২. নামাজের সময় অনুযায়ী দিনের পরিকল্পনা সাজানো

আমাদের প্রতিদিনের কাজের সূচি যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়, তবে জীবনে এক ধরণের শৃঙ্খলা চলে আসে। এই পবিত্র সমন্বয় কেবল কাজের গতিই বাড়ায় না, বরং পুরো দিনের সমস্ত কাজে আল্লাহর বিশেষ বরকত ও রহমত নিয়ে আসে।

৩. পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা

মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক যদি শ্রদ্ধা, সততা এবং বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তবে সেখানে মানসিক শান্তি বজায় থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় রাখার এবং আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। সুসম্পর্ক ও সুন্দর আচরণ জীবনে বরকত আসার অন্যতম বড় মাধ্যম।

শেষ কথা

বরকত হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার, যা মানুষের পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ইতিবাচক মানসিকতা এবং সুন্দর চরিত্র গঠনের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঘর, হৃদয় এবং সমাজকে বরকতময় করে তুলতে পারি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category