কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের
বহুদূর থেকে ভেসে আসা সুর
মাইন সরকার
বহুদূর থেকে ভেসে আসা সুর কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা গ্রন্থ। নামটির মধ্যে এক ধরনের আকুলতা পরিলক্ষিত হয়। যা পাঠকের মনে অনুরণন তোলে। প্রেম, বেদনা, আশা, স্বপ্ন সবকিছুই যেন দূর
থেকে ভেসে আসে। এ যেন এক নিরব আঘাতের মতো উলটপালট ঢেউ তোলে। শিকড়ের টান এক নিঃসঙ্গ আবেগের গভীরতা অনুভূতির দরজায়
কড়া নাড়ে।
কবিতা : বহুদূর থেকে ভেসে আসা সুর
“বহুদূর থেকে কী-এক শব্দ ভেসে আসছে
অনুমান- আন্দাজ করার আগে ভাবনার পাল খাটিয়ে খানিক
তাকিয়ে থাকি দূরের পর্দায়– অদৃশ্য অথচ জ্বল জ্বল – করা
দৃষ্টিসীমায় দিগন্তপ্রসারী হাওয়ার নাচন
নাচের মুদ্রার সঙ্গে সুর তরঙ্গের কী ভীষণ দাপাদাপি!
বহুদূরে কোথাও চলছে অমৃত কথন
সুরের মায়াজাল ভেসে আসছে লগ্ন ছাপিয়ে”
কেন জানি মনে হয় এই সুর কোনো সাধারণ সুর নয়। এ এক ধ্যানমুখী অন্তহীন সুর।
সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা উপলব্ধির স্পন্দিত বিশ্ব ব্রাহ্মান্ডের লীলা। এটা হতে পারে আত্মার গভীর থেকে, চেতনার অতল স্তর থেকে সত্যকে ধরার
চেষ্টা। বহুদূর থেকে ভেসে আসে যে আহ্বান, এ আহবান যেন হয়ে ওঠে কবির আত্মসমর্পণের অপেক্ষা। যে সমর্পণে যে প্রাণশক্তির প্রবাহে কবিও
আলোকিত হয়ে ওঠেন। এই কবিতাকে আমরা গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে, এটি একটি আধ্যাত্বিক কবিতা। যেখানে ধ্যানের গভীরে গেলে সময় আর কাজ করে না। মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত সাধনার স্তরে
পৌঁছে যান।
কবিতা : বিস্ময়ে আমি বোবা হয়ে যাই
” ঘন অরণ্যের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাই
সবুজের সমারোহে মাখামাখি বনবীথি, কী প্রচণ্ড টান
প্রকৃতির পেলবতায় ছুঁয়ে দেওয়ার কী প্রবল আকর্ষণ!
গাছ- লতাপাতা — যতোদূর হাত যায়
ছুঁয়ে দিই, মুগ্ধতায় দিতে থাকি
ভালোবাসা ঢেলে”
এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে কবি বাকরুদ্ধ,
অরণ্যের মাঝ দিয়ে কবি যখন হেঁটে যান তখন
সেখানে আর কোনো কোলাহল নেই। এই শান্ত নিথর বনবীথি যেন সবুজে স্নাত। প্রকৃতি এখানে নিরব
প্রেমিকার মতো তাই মুগ্ধতায় কবি বিস্ময়ে বোবা হয়ে
গেছেন। এখানে কবির চয়ন করা প্রতিটি চিত্রকল্প যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আবার যদি আমরা ভিন্ন দৃষ্টিতে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাবো, অহম ও ভোগ বিলাসীতা ছেড়ে কবি প্রবেশ করেছেন নিঃস্বার্থ
এক প্রেমের জগতে। কবি নিজেকে যখন প্রকৃতির
কাছে বিলিয়ে দেন তখন কবি এই বিলীনতার
মাঝেই খুঁজে পান পরম সত্তাকে।
দ্বিতীয় স্তবকে কবি লিখেছেন —
কচিপত্র- পল্লবে, রঙে বাহারে
সৃষ্টির জৌলুস, স্রষ্টার মাহাত্ম্য
মাটি ফুঁড়ে উঠিয়াছে
দিয়েছে চোখে আঙুল
দৃষ্টিকে তীক্ষ্ণ না -করেই বোধের
ওপর দাঁড়িয়ে থাকি।
আর দেখি, শান্ত অচঞ্চল অরণ্য জীবন
দৃষ্টির বাইরে বাকি থাকে যতটুকু
তাতে শান্তিতে জ্বালিয়ে রাখি ধূপ
আরিফ মঈনুদ্দীনের এই কবিতার মধ্য যেমন প্রকৃতির কচিপত্র- পল্লবের সৌন্দর্য ফোটে ওঠে
একজন পাঠককে এই সৌন্দর্য বুঝতে গভীর বিশ্লেষণের দরকার নেই। সৌন্দর্য অনুভব করলেই হয়। আলোচ্য এই কবিতার সঙ্গে রবাট ফ্রস্টের কবিতা
” Stopping by woods on a snowy evening. ”
কবিতায় ভাবগত মিল পাওয়া গেলেও প্রকাশ ভঙ্গি আলাদা। ফ্রস্টের কবিতায় নীরব স্থির বন মানুষের মনকে থামিয়ে দেয়। যা গভীর দার্শনিক ইঙ্গিত বহন
করে আর কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের এই কবিতাটি
গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখলে এখানে সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভক্তি স্পষ্টত।
প্রকৃতির নবজাগরণ সাধকের বোধকে জাগিয়ে তোলে, কবি তাই তার শান্ত স্বরূপকে অনুভব
করেন। আরিফ মঈনুদ্দীনের এই স্তবক পাঠক হৃদয়কে আধ্যাত্বিক উপলব্ধির দিকে টেনে নেয়।
তাই কবি হৃদয় নীরব ভক্তির ধূপ জ্বালিয়ে রাখে।
আবার প্রকৃতির কচিপাতা, সবুজ ও সৌন্দর্যের মধ্য
সৃষ্টির মহিমা উপলব্ধি করা যায়।
শেষ স্তবকে কবি বিস্ময়াভিভূত বলেন–
গাছ ফুল পাখি আছে
পল্লব মর্মর আর কিচিরমিচির শব্দ আছে।
চোখেমুখে আমার অবাক ফোটে
বিস্ময়াভিভূত আমি বসে থাকি চুপ।
চারপাশের গাছ, ফুল, পাখি পল্লবের মর্মর আর কিচিরমিচির যেন এক জীবন্ত সুর বয়ে আনে।
কবির একান্ত মনোভূমিতে এ যেন এক সুরেলা আঘাত। তাই সবশেষে কবি চিরায়ত দৃশ্যের গভীরে
চুপ হয়ে গেছেন। এখানে কবি মানুষের অন্তর্লোকের
গভীর বিস্ময় ও মুগ্ধতার কথা বলেছেন।