• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন

কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায়

মাইন সরকার
Update : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের
সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায়

মাইন সরকার

সমুদ্র হলো পৃথিবী পৃষ্ঠের একটি বড় অংশ। সমুদ্র নামটি শুনলেই মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে এক মনোমুগ্ধকর ছবি। যেখানে বিশাল আকাশ জলরাশি
আর উত্তাল ঢেউয়ের দাপট। কবিদের একটি নিজস্ব সমুদ্র আছে যেখানে সুগভীর ঢেউ ওঠে, ঢেউ ভাঙে আবার শান্ত হয়। বিশ্ব সাহিত্যে সমুদ্র হয়ে উঠেছে এক প্রেমিক সত্তা। যেমন চিলির মহান কবি পাবলো
নেরুদা উপকূলীয় অঞ্চলে বড় হওয়ায় সমুদ্র তাঁর কবিতা সৃষ্টিতে এক প্রেমিক আত্মার পদাবলি।
কিংবা অ্যামেরিকান ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ” দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান দ্য সি ” উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্তিয়াগোর একাকীত্ব জীবনের পরম বন্ধু। এই সমুদ্র হয়ে উঠেছিলো তাঁর জীবন ও জীবিকার আশ্রয়। আর এখানে কবি আরিফ মঈনুদ্দীন সমুদ্রকে মহাজাগতিক শক্তিতে পরিণত করেছেন তাঁর গভীর তাৎপর্যপূ্ণ কবিতা গ্রন্থ ” সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায় ”

কবি আরিফ মঈনুদ্দীনের এই সমুদ্র যেন এক জাদুময়তার নাম। আবার কবির যাপিত জীবনের
গভীর আবেগ খুঁজে পাওয়া যায়।
উত্তালতায় পরিপূর্ণ ষোড়শী সমুদ্র বেলা কিংবা অবেলায় কবিকে ডাকে, কবিকে কখনো তার মতো উত্তাল আবার কখনো শান্ত নিথর করে দেয়। সমুদ্রের ফেনায়িত ঢেউ কবির মনোবিশ্বকে পাগল করে। গভীর প্রেমানুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। সমুদ্রের কাছে এলে কবির সকল গোপন অনুরাগ লোকিয়ে পরে। সমুদ্র যেন মুক্তি ও মহাবিশ্বের এক গভীর সংযোগ।

সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায়

সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায়
নিজের ক্ষুদ্রতা দেখে অবাক হয়, আবার
বিস্ময় জাগে– নদী শাসন এবং
সমুদ্র শাসনের ভার মানুষের হাতে দেখে

সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায়
বড় হয়ে যায় মনের আকাশ
উদারতার সবক নিতে – নিতে ভেঙে ফেলে মনের দেয়াল
যেমন ‘দেয়াল তুললে ঘর
দেয়াল ভাঙলে পৃথিবী ‘
তারও অধিক সমুদ্রের শিক্ষা
মন ঘুরে আসে মেরু থেকে মেরুতে
প্রদক্ষিণের পদতলে একাকার উত্তরমেরু দক্ষিণমেরু

কবির গভীরতম ভাষায় এখানে সমুদ্র শুধু সমুদ্র নয়।
এটা সেই সমুদ্র যার সামনে দাঁড়িয়ে কবি তাকে পরিমাপ করতে পারেন। সমুদ্র আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কবি নিজের ভেতর বাহির প্রদক্ষিণ করে আসতে পারেন। কবি যেন তাকে চির নব রুপে খুঁজে পায়। কেবল সমুদ্রের কাছে এলেই মানুষ বললে যায়।
সমুদ্র তার যৌবনাটানে কবিকে ভেঙেচুরে আবার গড়ে তোলে। অথচ পৃথিবীর মানুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সমুদ্রকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সমুদ্রের কাছে এলেই
কবি মুহুর্তেই ঘুরে আসে পৃথিবীর পথ।

এই কবিতার শেষ স্তবকে কবি বলেছেন

সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায়
অন্তত একবার হলেও সমুদ্রের কাছে এসো
অপার বিস্ময়ে অভিভূত তুমি বদলে যাবে,
ভুলে হলেও নিয়ে ফেলবে ভালো থাকার শপথ।

এই কবিতার শেষ স্তবকে কবি আহ্বান করেছেন
অন্তত “একবার হলেও সমুদ্রের কাছে এসো”
এখানে সমুদ্রের কাছে যাওয়া মানে নিজের ভেতরে
ফিরে যাওয়া। নিজের ভেতর ফিরে গেলেই ভেতরের অহংকার, সংকীর্ণতা, অস্থিরতা সব ডুবে যাবে
সমুদ্র জলে। সমুদ্রের ফেনায়িত জল থেকে ভেসে আসবে ষোড়শী সমুদ্রের ডাক। সেখানেই ফোটে আছে পৌরুষেয় আরাধ্য গোলাপ।

সমুদ্র তুমি আমাকে উদ্বেল করেছ

হে সমুদ্র, তুমি আমাকে উত্তাল উদ্বেল করেছ
আমি উদ্বাহু — আকাশ স্পর্শ করা আর বেশি বাকি নেই
অকস্মাৎ আমার উদ্ধত স্বভাবের ষোলোআনা থমকে গিয়ে স্থির
ললনাদের লালিত্বে তোমার ভরসাময় প্রশ্রয়ের হাত
উদারতার সবক দিতে- দিতে খুলে দিয়েছে অর্গল
নড়েচড়ে বসেছে পৃথিবী
মহাবিশ্বময় সান্নিধ্যের হাহাকার
লাস্যময়ীর ভেতরে তুৃমি বিছিয়ে দিয়েছ মহাকালের চাদর

তোমার হাসি
তোমার হাসির চেয়ে সুন্দর কিছু পৃথিবীতে নেই
আমি মন্তন করেছি আকাশপাতাল, বনবাদাড়
পায়ের তলায় তন্নতন্ন গুলবাগ দেখে বিস্ময় জাগে,
জলপ্রপাত, ঝরনার পতন দেখে হতবাক

“তোমার হাসি ” কবিতাটি এক তীব্র প্রেমময় অনুভূতির চূড়ান্ত রুপ, কবিরা সব সময়ই প্রেমিক, প্রেম ও বিনয় দিয়েই জয় করেন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য। কবিতায় প্রিয়জনের হাসির সৌন্দর্য যেন
সমগ্র পৃথিবীর সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যায়। গুলবাগ, বনবাদাড়, জলপ্রপাত এমনকি ঝর্ণারও পতন কবিকে
হতবাক করে। এই সব যেন তার প্রিয়তমার হাসির
কাছে থমকে দাঁড়ায়। এই হসিতেই যেন মিশে আছে জীবনের অর্থ।

কবিতার জন্য

কবিতার জন্য ঘর ছেড়েছি
কবিতার জন্য তোমাকে ছেড়ে যাবো ভাবছি
আমি অবাক হয়ে দেখলাম ঘরেও পড়ে আছে কবিতা
তোমাকে ছেড়ে যাওয়া হলো না
তুমিই তো কবিতার বীজ
যত্রতত্র কবিতা — আনন্দের দুঃখের – ব্যথার- বেদনার – প্রতারণাও
তুমি হাঁটছো ফুটছে কবিতার খই– তোমার হাঁটার ছন্দে কবিতা

তোমার হাতের ইশারায় কবিতার সেকি দোলাচল
তোমার আঙুলের মুদ্রায় কবিতার ওঠবোস
তোমার চোখে কবিতার কামিনী -স্বভাব
তোমার হাসিতে কবিতার মরে মরে বেঁচে ওঠার উল্লাস
তোমার সারা অঙ্গে কবিতার আহ্লাদী বিচরণ
ঘরের তৈজসপত্রের টুংটাং শব্দে কবিতার বেজে ওঠা —
সেও তোমারই হাতের ছোঁয়ায়

কবি তাঁর সৃষ্টি কবিতা এবং প্রিয় মানুষকে একাকার
করে তোলেছেন। কবিতার জন্যে কবি পৃথিবীর অনেক কিছু ত্যাগ করতে চায়। কবির কল্পনায় কবিতাই চূড়ান্ত লক্ষ্য। কবির ঘরেই তার চিরন্তন কবিতা রয়েছে। কবির প্রিয়তমাই কবিতার প্রকৃত বীজ। এখান থেকেই কবিতার যাত্রা শুরু। এখানে মূলত বলতে চেয়েছেন প্রিয়তমাকে ছাড়া কবিতা খুঁজা অর্থহীন কবির প্রিয়তমার মধ্যেই পৃথিবীর সমস্ত কবিতা।

কবি আরিফ মঈনুদ্দীন তাঁর জীবনকালে কতগুলো সমুদ্র দেখেছে এটা আমি বলতে পারি না তবে সমুদ্র
কবিকে গভীরভা জাগিয়ে তোলেছে।
“সমুদ্রের কাছে এলে মানুষ বদলে যায় ” এটি প্রকৃতপক্ষে একটি সার্থক কবিতা গ্রন্থ। যেখানে সমুদ্রের বিশালতা, গভীরতা, অনিশ্চয়তা হলো মানুষের ভেতর জগতের প্রতিফলন। সমুদ্রের কাছে এলে মানুষের সমস্ত অন্ধকার মুছে যায়। স্মৃতি পাতায় ভেসে ওঠে ছবি। আনমনে হয় ছবির সাথে কথোপকথন। প্রতিটি আত্মা যখন নিজেকে ধুয়ে ফেলে সমুদ্র জলে তখন পাপীহৃদয়ও স্বপ্ন দেখতে
শুরু করে। কবি তার কল্পনাকে প্রসারিত করে
আর আমাকে সমুদ্র তছনছ করে দেয়। সিলগালা করে দেয় জাগতিক মোহ। তাই বাসন্তীর ডাক অপেক্ষা করে আমিও যাত্রা করতে চাই” চ্যালেঞ্জার
ডিপে”। সমুদ্রের কাছে এলে আমিও হয়ে ওঠি
একেবারে আনকোরা অন্ত্যজ। সমুদ্র পাড় ঘেঁষে মনোবিশ্বে জেগে ওঠে চেরি ব্লসমের স্বর্গীয় রুপ।
একজন কুলীন মানুষ হয়ে ওঠার বেদনা কমে যায়।

টেড হিউজ কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেছিলেন ” কবিতা হলো এক চিকিৎসার নাম যার দ্বারা কবিরা পৃথিবীর বেদনা কমায়”।

সমুদ্র পাড়ে গেলে কবির মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করে, বোহেমিয়ান সমুদ্রের চিরকালীন ষোড়শীর রুপ ভেসে আসে ফেনায়িত জলে।

কবি আরিফ মঈনুদ্দীন বলতে চেয়েছেন
মানুষ কিভাবে সমুদ্রের কাছে এলে বদলে যায়
এই সত্যটিকেই কবিতায় প্রকাশ করেছেন।
আশাকরি একজন কবিতা পাঠকের কাছে
গ্রন্থটি সার্থক ও অর্থবহ হয়ে উঠবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category