• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০১ পূর্বাহ্ন

জালাল উদ্দিন রুমি: সুফি-সাধকদের ইমাম যিনি

ধর্ম ডেস্ক
Update : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

জালাল উদ্দিন রুমি। আসল নাম মোহাম্মদ ইবনে মোহাম্মদ ইবনে হোসেন বাহাউদ্দিন আল-বালখি (১২০৭-১২৭৩)। তার বংশধারা গিয়ে মিলেছে খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিকের (রা.) বংশধারায়। তিনি একাধারে কবি, হানাফি ফকিহ, সুফি তাত্ত্বিক ও আইনজ্ঞ ছিলেন।

ফারসি বংশোদ্ভূত হলেও তিনি জীবন কাটিয়েছেন বর্তমান তুরস্কে। সেলজুক রুম সাম্রাজ্যের অধীনস্থ আনাতোলিয়ার বলখ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় বসবাস করার কারণে তিনি রুমি নামে পরিচিতি লাভ করেন।

তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন ফারসি কবি শামস তাবরিজি। তিনি রুমির সাথে একই বাড়িতে দীর্ঘ বছর বসবাস করেছিলেন।

১২৭৩ সালের ডিসেম্বরে সুফি রুমি তুরস্কের আঙ্কারার দক্ষিণে অবস্থিত কোনিয়া শহরে মৃত্যুবরণ করেন।

কবি ও সাহিত্যিক রুমি

রুমির সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি ‘মাসনবী ই মানবী’। ফারসি ভাষায় লেখা প্রায় হাজার কবিতার এই সংকলন সুফিদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। একে ঐশ্বরিক ও সুফি প্রেমের সেরা সাহিত্যকর্ম এবং অন্যতম প্রধান সুফি কাব্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ধারণা করা হয়, রুমির কবিতার সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এর পাশাপাশি তার গুরুর স্মরণে লেখা ‘দেওয়ান-ই শামস তাবরিজি’ অন্যতম। এছাড়া তার রচিত বিখ্যাত ‘রুবাঈয়াত’ বা চার চরণের কবিতা সংকলনে ১ হাজার ৯৫৯টি রুবাঈতে ৩ হাজার ৩১৮টি চরণ রয়েছে।

গদ্য সাহিত্যেও রুমি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। এর মধ্যে শিষ্য ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠি সংকলন ‘আর-রাসায়িল’, উপদেশমূলক বক্তব্যের সংকলন ‘আল-মাজালিস আস-সাবআ’ এবং ৭১টি ভিন্ন ভিন্ন বক্তৃতার সংকলন ‘ফিহি মা ফিহি’ উল্লেখযোগ্য।

ইবনে বতুতার চোখে মধ্যযুগের আতিথেয়তা
তিনি প্রথমে বাবার কাছে ফিকহ ও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে দামেস্ক, আনাতোলিয়া, বাগদাদ ও কোনিয়া সফরের সময় পীর সৈয়দ বুরহানউদ্দিন বালখী। তিরমিজি, মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি এবং ফরিদ উদ্দিন আত্তারের মতো সাধকদের সান্নিধ্যে এসে প্রভাবিত হন। আল্লামা আত্তার রুমির বাবাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এই শিশুটির যত্ন নিন, খুব শিগগিরই সে বিশ্বজুড়ে এক প্রদীপ্ত আত্মায় পরিণত হবে।

বলখ শহরে মঙ্গলদের আক্রমণের পর তার বাবা পরিবারসহ প্রথমে বাগদাদ ও মক্কায় যান এবং পরবর্তীতে কোনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

শিক্ষক রুমি

বাবার মৃত্যুর পর তিনি মানুষকে উপদেশ দিতে শুরু করেন এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য শামে যান। সেখানে আলেম ও শায়খদের সান্নিধ্যে থেকে নিজের মেধার চরম বিকাশ ঘটান। পরে কোনিয়ায় ফিরে শিষ্যদের দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। তার প্রজ্ঞা ও ফিকহি পাণ্ডিত্যের কারণে শিষ্যরা তাকে আসাদুল মাআরিফ (জ্ঞানের সিংহ), মাওলানা, ইমামুদ দ্বীন ওয়া শরিয়াহ এবং সুলতানুল আরিফিন উপাধিতে ভূষিত করেন।

শায়খ তাবরিজির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের পর তিনি ফিকহ ও শরিয়তের গণ্ডি পেরিয়ে এক দর্শনাশ্রিত সুফিবাদে মনোনিবেশ করেন।

তার সুফি দর্শন মানুষে মানুষে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতার বার্তা দেয়। তাই তার মৃত্যুর পর তার কফিন বহন করেছিলেন ফারসি, তুর্কি, আরব ও সেলজুক রুমের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। বাবার কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। রুমির ইন্তেকালের রাতকে তার অনুসারীরা ‘উরস’ বা আধ্যাত্মিক মিলন রাত হিসেবে অভিহিত করেন এবং আজও তারা মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপন করেন।

কোনিয়ার জালাল উদ্দিন রুমি কমপ্লেক্সে তার অনুসারী সুফিরা যে ঘুরন্ত নাচের পারফরম্যান্স করেন, তা দেখতে স্থানীয় ও দর্শনার্থীদের ভিড় জমে।

আরবি ভাষায় রুমির লেখা ও চিন্তাধারা অনুবাদে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন সাহিত্যিক ঈসা আল-আকুব। তার আগে শেখ সাবি আল-শালান, মোহাম্মদ কাফাফি, হোসেন মুজিব আল-মাসরি এবং আল্লামা মোহাম্মদ ইকবালসহ অনেকেই তার কাজ অনুবাদ করেন।

এমনকি তার জীবন নিয়ে হলিউডে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওকে মূল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়। তবে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

রুমির প্রভাব

ইরাকের সাহিত্যিক জাওয়াদ মহসিন রুমি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তিনি বলেন, তাবরিজির সাথে পরিচয়ের পর রুমি শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি ইবাদত ও কবিতায় আত্মনিয়োগ করেন। তার মৃত্যুর পর কবিতা ও এই বৃত্তাকার নাচের মাধ্যমে মৌলভী ধারার সৃষ্টি হয়, যা বিশ্বজুড়ে আজ অবধি সমাদৃত।

রুমির মৃত্যুর পর তার সমাধিসৌধে লেখা হয়, যদি আমাদের কবর খুঁজতেই হয়, তবে দূর দেশ সফর করো না; আমাদের কবর তো জ্ঞানীদের হৃদয়েই।

ইরাকের গবেষক ফালাহ আল-খাইয়াত বলেন, ২০০৭ সালে রুমির ৮০০তম জন্মবার্ষিকীতে যুক্তরাষ্ট্রে তাকে নিয়ে আগ্রহের পারদ তুঙ্গে ওঠে। ইউনেস্কো রুমির নামে পদক বিতরণ করে এবং ঘোষণা দেয়, রুমির ধ্যান-ধারণা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা ইউনেস্কোর লক্ষ্যেরই একটি অংশ।

মাইস্পেস ডটকমের মতো প্ল্যাটফর্মে তাকে কেন্দ্র করে ২৮টিরও বেশি ওয়েবসাইট এবং ২২০০টিরও বেশি ভিডিও ফুটেজ তৈরি হয়েছিল।

আল-খাইয়াত মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বে রুমির এই গ্রহণযোগ্যতার মূলে রয়েছে রেয়নাল্ড নিকোলসন, আর্থার জন আরবেরি এবং অ্যান মেরি শিমেলের মতো ওরিয়েন্টালিস্টদের নিবিড় অনুবাদ কর্ম।

সূত্র : আল জাজিরা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category