ঢাকা ০১:৫০ এএম, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালয়েশিয়ায় হাইকমিশনের অবহেলায় বাংলাদেশির মৃত্যু, দায় কার?

নিজেস্ব প্রতিবেদন
  • আপডেট সময় : ০৬:২৮:৫৬ পিএম, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৬ শেয়ার হয়েছে
সংবাদ কথা অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের দায়িত্বহীনতা আর চরম মানবিক অবহেলায় এক প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। মরদেহ দ্রুত দেশে প্রেরণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

আজ (১৩ এপ্রিল) স্ত্রীকে সাথে নিয়ে দূতাবাসে সশরীরে হাজির হয়ে ট্রাভেল পাসের অপেক্ষায় থাকা লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার চররোহিতা গ্রামের বাসিন্দা সোলেমান হায়দারের ছেলে অরুণ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায় ১ ঘণ্টা পর অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে উপস্থিত প্যারামেডিক নার্স তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মালয়েশিয়ায় ১০ মিনিটেই অ্যাম্বুলেন্স হাজির হয়। সময়মতো চিকিৎসা পেয়ে হয়তো বেঁচে যেতেন অরুণ। দূতাবাসের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ বেশ পুরোনো, ২০২৩ সালে হাইকমিশনের অবহেলায় পাসপোর্ট ভিসা থাকার পরও বেওয়ারিশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় দাফন করা হয় কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শাওনকে। সে সময় শাওনের মা অভিযোগ করেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানানোর পরও কোনো ধরনের সহায়তা পাইনি। মা হয়ে ছেলের মরা মুখটাও দেখা হয়নি।

আজ (সোমবার) অরুণের মৃত্যুতে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ দূতাবাসের সেবা নিয়ে। প্রবাসীদের অভিযোগ ট্রাভেল পাস নিতে সবাইকেই কেন সশরীরে আসতে হবে? এ ছাড়া অসুস্থ, প্যারালাইজড কিংবা চলাচলে অক্ষম লোকের জন্য ব্যবস্থা কী? মালয়েশিয়া সরকার কোনোরকম জরিমানার মুখোমুখি ছাড়াই অনথিভুক্ত বিদেশি শ্রমিকদের নিজ দেশের ফেরার সুযোগ দিয়েছে, যা শেষ হবে চলতি মাসের ৩০ তারিখে। তবুও থেমে নেই ধরপকাড়। পুলিশের হাতে আটক (অপারেসি) হওয়ার ভয়ে যারা কুয়ালালামপুর হাইকমিশনের যেতে পারেন না, অনেক দূরে দূরে থাকেন তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নাই।

এ ছাড়া ট্রাভেল পাস প্রসেস করতে দীর্ঘ সময় লাগে। একটা ট্রাভেল পাস প্রসেসের জন্য একজন ব্যক্তির সারা দিনের সময় ও মজুরি নষ্ট হয়। দূতাবাসের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় মিশনের অভ্যন্তরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয় রেমিটেন্স যোদ্ধার।

দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর সৈয়দ শরীফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের কলিংয়ে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নামে-বেনামে ভুয়া কোম্পানিতে শ্রমিক নিয়োগ (এটেস্টেশন) অনুমোদনের গুরুত্বর অভিযোগ থাকলেও সেসবের তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো নিজেদের অনিয়ম আড়াল করে মিথ্যে স্বচ্ছতার নাটক সাজিয়ে পাসপোর্ট থাকার পরেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পাস নিতে সশরীরে দূতাবাসে হাজির হয়ে হয়রানির শিকার হওয়া লাগে। অথচ একজন অসুস্থ বাংলাদেশির সাথে ভিডিও কলে কথা বলে বাংলাদেশি নাগরিক নিশ্চত হয়ে ডাকযোগে অথবা তার প্রতিনিধির কাছে ট্রাভেল পাস দিয়ে দূতাবাস দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত।

প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি থাকা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি হাইকমিশনের গুরুত্বপূর্ বিভাগ শ্রম শাখা। শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, বেতন-ভাতা, আবাসন এবং কর্ম নিশ্চয়তা, আইনি সহায়তাসহ জেলখানা পরিদশনে গিয়ে সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের খোঁজ খবর নিয়ে দ্রুত দেশে পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয়। অথচ দূতাবাসের সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য এই শ্রম শাখায়। অভিযোগ রয়েছে প্রথম সচিব এ এস এম জাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধেও।
উল্লেখ্য, জীবিকার তাগিদে ২০১২ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জামান। এরপর ২০১৭ সালে স্ত্রী শাহানাজকে নিজের কাছে নিয়ে যান। এর আগেও অরুণ স্ট্রোক করে হাসপালে চিকিৎসা নেন। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা ব্যয় বহুল হওয়ায় দ্রুত দেশে চিকিৎসা নিতে ট্রাভেল পাশের জন্য হাইকমিশনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অরুণ শাহানাজ দম্পাতির ১৮ বছরের একটি পূত্র সন্তান রয়েছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ হাইকমিশন মৃত অরুণের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। মরদেহ দ্রুত দেশে প্রেরণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এদিকে দূতাবাসের বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হাইকমিশনের প্রেস সেক্রেটারির জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি বলে দূতাবাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মালয়েশিয়ায় হাইকমিশনের অবহেলায় বাংলাদেশির মৃত্যু, দায় কার?

আপডেট সময় : ০৬:২৮:৫৬ পিএম, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের দায়িত্বহীনতা আর চরম মানবিক অবহেলায় এক প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। মরদেহ দ্রুত দেশে প্রেরণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

আজ (১৩ এপ্রিল) স্ত্রীকে সাথে নিয়ে দূতাবাসে সশরীরে হাজির হয়ে ট্রাভেল পাসের অপেক্ষায় থাকা লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার চররোহিতা গ্রামের বাসিন্দা সোলেমান হায়দারের ছেলে অরুণ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায় ১ ঘণ্টা পর অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে উপস্থিত প্যারামেডিক নার্স তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মালয়েশিয়ায় ১০ মিনিটেই অ্যাম্বুলেন্স হাজির হয়। সময়মতো চিকিৎসা পেয়ে হয়তো বেঁচে যেতেন অরুণ। দূতাবাসের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ বেশ পুরোনো, ২০২৩ সালে হাইকমিশনের অবহেলায় পাসপোর্ট ভিসা থাকার পরও বেওয়ারিশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় দাফন করা হয় কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শাওনকে। সে সময় শাওনের মা অভিযোগ করেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানানোর পরও কোনো ধরনের সহায়তা পাইনি। মা হয়ে ছেলের মরা মুখটাও দেখা হয়নি।

আজ (সোমবার) অরুণের মৃত্যুতে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ দূতাবাসের সেবা নিয়ে। প্রবাসীদের অভিযোগ ট্রাভেল পাস নিতে সবাইকেই কেন সশরীরে আসতে হবে? এ ছাড়া অসুস্থ, প্যারালাইজড কিংবা চলাচলে অক্ষম লোকের জন্য ব্যবস্থা কী? মালয়েশিয়া সরকার কোনোরকম জরিমানার মুখোমুখি ছাড়াই অনথিভুক্ত বিদেশি শ্রমিকদের নিজ দেশের ফেরার সুযোগ দিয়েছে, যা শেষ হবে চলতি মাসের ৩০ তারিখে। তবুও থেমে নেই ধরপকাড়। পুলিশের হাতে আটক (অপারেসি) হওয়ার ভয়ে যারা কুয়ালালামপুর হাইকমিশনের যেতে পারেন না, অনেক দূরে দূরে থাকেন তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নাই।

এ ছাড়া ট্রাভেল পাস প্রসেস করতে দীর্ঘ সময় লাগে। একটা ট্রাভেল পাস প্রসেসের জন্য একজন ব্যক্তির সারা দিনের সময় ও মজুরি নষ্ট হয়। দূতাবাসের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় মিশনের অভ্যন্তরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয় রেমিটেন্স যোদ্ধার।

দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর সৈয়দ শরীফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের কলিংয়ে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নামে-বেনামে ভুয়া কোম্পানিতে শ্রমিক নিয়োগ (এটেস্টেশন) অনুমোদনের গুরুত্বর অভিযোগ থাকলেও সেসবের তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো নিজেদের অনিয়ম আড়াল করে মিথ্যে স্বচ্ছতার নাটক সাজিয়ে পাসপোর্ট থাকার পরেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পাস নিতে সশরীরে দূতাবাসে হাজির হয়ে হয়রানির শিকার হওয়া লাগে। অথচ একজন অসুস্থ বাংলাদেশির সাথে ভিডিও কলে কথা বলে বাংলাদেশি নাগরিক নিশ্চত হয়ে ডাকযোগে অথবা তার প্রতিনিধির কাছে ট্রাভেল পাস দিয়ে দূতাবাস দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত।

প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি থাকা মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি হাইকমিশনের গুরুত্বপূর্ বিভাগ শ্রম শাখা। শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, বেতন-ভাতা, আবাসন এবং কর্ম নিশ্চয়তা, আইনি সহায়তাসহ জেলখানা পরিদশনে গিয়ে সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের খোঁজ খবর নিয়ে দ্রুত দেশে পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয়। অথচ দূতাবাসের সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য এই শ্রম শাখায়। অভিযোগ রয়েছে প্রথম সচিব এ এস এম জাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধেও।
উল্লেখ্য, জীবিকার তাগিদে ২০১২ সালে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জামান। এরপর ২০১৭ সালে স্ত্রী শাহানাজকে নিজের কাছে নিয়ে যান। এর আগেও অরুণ স্ট্রোক করে হাসপালে চিকিৎসা নেন। মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা ব্যয় বহুল হওয়ায় দ্রুত দেশে চিকিৎসা নিতে ট্রাভেল পাশের জন্য হাইকমিশনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অরুণ শাহানাজ দম্পাতির ১৮ বছরের একটি পূত্র সন্তান রয়েছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ হাইকমিশন মৃত অরুণের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। মরদেহ দ্রুত দেশে প্রেরণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এদিকে দূতাবাসের বিরুদ্ধে উঠা এসব অভিযোগ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হাইকমিশনের প্রেস সেক্রেটারির জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি বলে দূতাবাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।