ঢাকা ০৫:৪৩ এএম, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জল ও শব্দের সংকট: নদীর কান্না,ভাষার নিঃশ্বাস : মাহবুব সৈয়দ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
  • আপডেট সময় : ০৪:১৪:০২ এএম, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২৮ শেয়ার হয়েছে

{"remix_data":[],"remix_entry_point":"challenges","source_tags":["local"],"origin":"unknown","total_draw_time":0,"total_draw_actions":0,"layers_used":0,"brushes_used":0,"photos_added":0,"total_editor_actions":{},"tools_used":{"transform":2},"is_sticker":false,"edited_since_last_sticker_save":true,"containsFTESticker":false}

সংবাদ কথা অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

একটি জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকে দুটি অদৃশ্য স্তম্ভের ওপর—প্রকৃতি ও সংস্কৃতি। আমাদের ক্ষেত্রে সেই দুই স্তম্ভের নাম নদী ও ভাষা। নদী আমাদের ভূগোল,আর ভাষা আমাদের মনন। কিন্তু আজ এই দুইয়ের অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় উদ্বেগ,লজ্জা ও আত্মসমালোচনার ছায়া।

 

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা নদী, মেঘনা নদী, যমুনা নদী—এসব কেবল নদীর নাম নয়, এগুলো আমাদের ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ধারক। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে জনপদ, কৃষি, বাণিজ্য ও লোকসংস্কৃতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই নদীগুলো আজ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার শিকার।

শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক পদার্থ নদীর পানিকে বিষাক্ত করছে। নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠছে স্থাপনা; কোথাও কোথাও নদী সংকুচিত হয়ে পড়ছে সরু খালে। উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত বাঁধ ও খনন প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করছে। নদী যখন তার স্বাভাবিক স্রোত হারায়, তখন কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মৎস্যসম্পদ কমে যায়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদী কেবল পানি নয়; নদী একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা।

 

ভাষার ক্ষেত্রেও চিত্র খুব ভিন্ন নয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে—এই ইতিহাস আমাদের গর্ব। ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই ভাষাকে যথাযথ সম্মান দিচ্ছি?

শহুরে জীবনে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্কৃতি, এমনকি পারিবারিক পরিবেশেও বাংলা চর্চা সীমিত হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত বানান ও অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দের ব্যবহার বেড়েছে। ভাষা পরিবর্তনশীল—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তনের নামে যদি ভাষার শুদ্ধতা, সৌন্দর্য ও গভীরতা হারিয়ে যায়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়।

 

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা চিন্তার কাঠামো গড়ে। মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা দুর্বল হলে সৃজনশীলতা ও গবেষণাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাহিত্যপাঠ কমে গেলে সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন ভাষা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, প্রাণশক্তি হারায়।

নদী ও ভাষার সংকটের মধ্যে একটি মৌলিক মিল আছে—উদাসীনতা। নদীকে আমরা ব্যবহার করি, কিন্তু রক্ষা করি না। ভাষাকে আমরা বলি, কিন্তু লালন করি না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে—দখলমুক্তকরণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং মানসম্মত মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা জরুরি—নদী দূষণ থেকে বিরত থাকা, শিশুদের সঙ্গে শুদ্ধ ও স্বচ্ছ বাংলায় কথা বলা, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।

নদী ও ভাষা—দুটিই প্রবাহমান। প্রবাহ থেমে গেলে নদী হয়ে যায় মৃত জলাশয়, ভাষা হয়ে যায় নিস্তেজ শব্দমালা। উন্নয়নের নামে যদি আমরা নদী হারাই এবং আধুনিকতার নামে ভাষা বিসর্জন দিই, তবে শেষ পর্যন্ত হারাব নিজেদেরই।

 

এখনও সময় আছে— নদীর স্বাভাবিক স্রোত ফিরিয়ে দিতে হবে, ভাষার প্রাণ ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে। যদি আমরা আরও মুহূর্ত নষ্ট করি, নদী হয়ে যাবে শুষ্ক নদীশয্যা, ভাষা হয়ে যাবে নিঃশব্দ ধ্বনি। আমাদের দায়িত্ব কেবল জল বা শব্দ সংরক্ষণ নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জাতি, আমাদের ভবিষ্যত বাঁচানোর দায়।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

জল ও শব্দের সংকট: নদীর কান্না,ভাষার নিঃশ্বাস : মাহবুব সৈয়দ

আপডেট সময় : ০৪:১৪:০২ এএম, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

 

 

একটি জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকে দুটি অদৃশ্য স্তম্ভের ওপর—প্রকৃতি ও সংস্কৃতি। আমাদের ক্ষেত্রে সেই দুই স্তম্ভের নাম নদী ও ভাষা। নদী আমাদের ভূগোল,আর ভাষা আমাদের মনন। কিন্তু আজ এই দুইয়ের অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় উদ্বেগ,লজ্জা ও আত্মসমালোচনার ছায়া।

 

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা নদী, মেঘনা নদী, যমুনা নদী—এসব কেবল নদীর নাম নয়, এগুলো আমাদের ইতিহাস, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ধারক। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে জনপদ, কৃষি, বাণিজ্য ও লোকসংস্কৃতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই নদীগুলো আজ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার শিকার।

শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক পদার্থ নদীর পানিকে বিষাক্ত করছে। নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠছে স্থাপনা; কোথাও কোথাও নদী সংকুচিত হয়ে পড়ছে সরু খালে। উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত বাঁধ ও খনন প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করছে। নদী যখন তার স্বাভাবিক স্রোত হারায়, তখন কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মৎস্যসম্পদ কমে যায়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদী কেবল পানি নয়; নদী একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা।

 

ভাষার ক্ষেত্রেও চিত্র খুব ভিন্ন নয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে—এই ইতিহাস আমাদের গর্ব। ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই ভাষাকে যথাযথ সম্মান দিচ্ছি?

শহুরে জীবনে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্কৃতি, এমনকি পারিবারিক পরিবেশেও বাংলা চর্চা সীমিত হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকৃত বানান ও অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দের ব্যবহার বেড়েছে। ভাষা পরিবর্তনশীল—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তনের নামে যদি ভাষার শুদ্ধতা, সৌন্দর্য ও গভীরতা হারিয়ে যায়, তবে তা উদ্বেগের বিষয়।

 

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা চিন্তার কাঠামো গড়ে। মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা দুর্বল হলে সৃজনশীলতা ও গবেষণাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাহিত্যপাঠ কমে গেলে সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন ভাষা কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়, প্রাণশক্তি হারায়।

নদী ও ভাষার সংকটের মধ্যে একটি মৌলিক মিল আছে—উদাসীনতা। নদীকে আমরা ব্যবহার করি, কিন্তু রক্ষা করি না। ভাষাকে আমরা বলি, কিন্তু লালন করি না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে—দখলমুক্তকরণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং মানসম্মত মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা জরুরি—নদী দূষণ থেকে বিরত থাকা, শিশুদের সঙ্গে শুদ্ধ ও স্বচ্ছ বাংলায় কথা বলা, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।

নদী ও ভাষা—দুটিই প্রবাহমান। প্রবাহ থেমে গেলে নদী হয়ে যায় মৃত জলাশয়, ভাষা হয়ে যায় নিস্তেজ শব্দমালা। উন্নয়নের নামে যদি আমরা নদী হারাই এবং আধুনিকতার নামে ভাষা বিসর্জন দিই, তবে শেষ পর্যন্ত হারাব নিজেদেরই।

 

এখনও সময় আছে— নদীর স্বাভাবিক স্রোত ফিরিয়ে দিতে হবে, ভাষার প্রাণ ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হবে। যদি আমরা আরও মুহূর্ত নষ্ট করি, নদী হয়ে যাবে শুষ্ক নদীশয্যা, ভাষা হয়ে যাবে নিঃশব্দ ধ্বনি। আমাদের দায়িত্ব কেবল জল বা শব্দ সংরক্ষণ নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জাতি, আমাদের ভবিষ্যত বাঁচানোর দায়।