মিজানুর রহমান - পাবনা প্রতিনিধি
পাবনায় শিক্ষা অফিসের ‘ভুল’ দেড় মাসেও মেলেনি ইংরেজি ভার্সনের বই
- আপডেট সময় : ০৪:২৮:১৬ পিএম, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৭৫ শেয়ার হয়েছে
পাবনায় শিক্ষা অফিসের ‘ভুল’ দেড় মাসেও মেলেনি ইংরেজি ভার্সনের বই
মিজানুর রহমান,পাবনা
পাঠদান শুরু হয়েছে দেড় মাস আগে। সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নতুন বইয়ের গন্ধে মাতোয়ারা হলেও পাবনা সদর উপজেলার দুটি বিদ্যালয়ের কয়েকশত কোমলমতি শিক্ষার্থীর স্কুলব্যাগ এখনো শূন্য। উপজেলা শিক্ষা অফিসের চরম অবহেলা এবং সময়মতো চাহিদা না পাঠানোর কারণে ইংরেজি ভার্সনের এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই পাওয়া যেখানে রাষ্ট্রীয় অধিকার, সেখানে কর্মকর্তাদের এমন ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ নিয়ে ফুঁসে উঠেছেন অভিভাবকরা।
ভুলের মাশুল দিচ্ছে শিশুরা:অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রতিবছরই চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করে। নিয়ম অনুযায়ী আগের বছর ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে চাহিদা তালিকা পাঠানোর কথা থাকলেও পাবনা সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীদের তথ্য নির্ধারিত সফটওয়্যারে যুক্ত না করায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পাবনা সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে পাঠানো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাপস কুমার অধিকারী সাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, সঠিক সময়ে চাহিদাপত্র দাখিল না করায় এই শিক্ষার্থীদের জন্য বই মুদ্রণই করা হয়নি। অর্থাৎ, খাতা-কলমে এই শিক্ষার্থীদের অস্তিত্বই যেন ভুলে গিয়েছিল স্থানীয় শিক্ষা অফিস। নতুন করে বই মূদ্রণ সম্ভব নয়। স্টোরে অবশিষ্ট থাকা সামান্য কিছু বই প্রেরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— সঠিক সময়ে চাহিদাপত্র না পাওয়ায় এসব বই মুদ্রণই করা হয়নি। অর্থাৎ, এক মাস ধরে শিক্ষা কর্মকর্তারা ‘বই আসবে’ বলে যে আশ্বাস দিয়ে আসছিলেন, তা ছিল স্রেফ শুভঙ্করের ফাঁকি। এখন কেন্দ্রীয় বাফার স্টক থেকে বই আনার কথা বলা হলেও তাতে দীর্ঘসূত্রিতার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বই নেই, চলছে ফটোকপিতে পাঠদান
এদিকে, স্কুল কর্তৃপক্ষ বিকল্প উপায়ে পাঠদান সচল রাখার চেষ্টা করলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
বিপাকে স্কুল কর্তৃপক্ষ :ইংরেজি ভার্সনের পাবনার স্বনামধন্য স্কয়ার স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহনাজ সুলতানা বলেন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বই আমরা পেয়েছি। তবে প্রতি ক্লাসে ৫৯ জন হিসেবে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় বই আমরা পাইনি।
তিনি বলেন, এই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য গতবছর আমরা বইয়ের চাহিদাপত্র দাখিল করেছিলাম। তবে বছরের শুরুতে বই পাবার কথা থাকলেও এখনো তিনটি শ্রেণির বই না মেলায় অনলাইন থেকে পিডিএফ কপি ডাউনলোড করে শিক্ষার্থীদের অধ্যায়ভিত্তিক ফটোকপি সরবরাহ করে পাঠদান অব্যাহত রাখা হয়েছে। ঠিক কি কারণে বই আসতে বিলম্ব হচ্ছে সেটি জানা নেই। তবে সঠিক পাঠদানে দ্রুত বই প্রয়োজন বলেও জানান এ অধ্যক্ষ।
নর্থপয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. ওলিউর রহমান বলেন, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বই পেলেও গণিত বইটি আমরা পাইনি। পুরনো বই ও ফটোকপি দিয়ে পাঠদান চলছে। তবে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বই আসবে বলে শিক্ষা অফিস থেকে জানানো হয়েছে।
অভিভাবকদের ক্ষোভ ও উদ্বেগ:ভুক্তভোগী কয়েকজন অভিভাবক জানান, ফেব্রুয়ারি শেষ হতে চলল, অথচ বাচ্চার হাতে এখনো বই নেই। স্কুল থেকে বলছে শিক্ষা অফিস বই দেয়নি। নতুন ক্লাসে নতুন বইয়ের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়া শিশুদের মানসিক অবস্থা নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা। চলতি বছর তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নুজহাত ই নূর বলেন,”ফেব্রুয়ারি শেষ হতে চলল, অথচ বাচ্চার হাতে বই নেই। কর্মকর্তাদের উদাসীনতার দায় কেন বাচ্চারা নেবে। শিশুরা ফটোকপি বা অনলাইন কপিতে পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:নিজের ভুল আংশিক স্বীকার করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল কবির বলেন, “চাহিদাপত্রে কিছু ত্রুটি থাকায় তা গ্রহণ করা হয়নি। আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি, আশা করছি আগামী দুই দিনের মধ্যে বই পৌঁছে যাবে।”
তবে বিষয়টি সহজভাবে নিচ্ছেন না পাবনার জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “শিক্ষার্থীদের বই নিয়ে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। কেন এমনটি হলো তা জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে জানতে চাওয়া হবে। গাফিলতি প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও শিক্ষানুরাগী আখতারুজ্জামান আখতার বলেন, “এটি কেবল ভুল নয়, এটি অপরাধ। শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।”
























